8:39 pm, Wednesday, 24 June 2026

নেছারাবাদে ফুলঝাড়ু শিল্পে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান পাচ্ছেন শত শত মানুষ

  • Reporter Name
  • Update Time : 05:47:18 pm, Tuesday, 23 June 2026
  • 35 Time View
৪২

মো. শামীম হোসাইনপিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলা-এর বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ওঠা ফুলঝাড়ু শিল্প এখন শত শত মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। কম পুঁজি, সহজ প্রযুক্তি এবং স্থানীয় শ্রমনির্ভর এই শিল্পে কাজ করে নারী-পুরুষ উভয়েই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ফলে অনেক পরিবারের জীবনযাত্রায় এসেছে স্বচ্ছলতা।উপজেলার মাগুরা, অলংকারকাঠী, পানাউল্লাহপুর, কুনিয়ারী, সংগীতকাঠী, সুটিয়াকাঠি, নান্দুহার ও জনতা বাজার এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি ছোট-বড় ফুলঝাড়ু কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় সরাসরি কাজ করছেন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিক।ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। কেউ ঝাড়ুর শলা ছাঁটছেন, কেউ হাতল লাগাচ্ছেন, আবার কেউ স্কচটেপ পেঁচিয়ে ঝাড়ুকে বাজারজাতের উপযোগী করে তুলছেন। পুরুষ শ্রমিকেরা উলুফুল ও পাটখড়ি গুনা দিয়ে ঝাড়ুর মূল অংশ তৈরি করেন। পরে নারী শ্রমিকেরা স্কচটেপ বা পিভিসি পাইপ লাগিয়ে কাজ সম্পন্ন করেন।ফুলঝাড়ু তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো উলুফুল বা ঝাড়ুফুল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ফুল পাওয়া গেলেও ব্যবসায়ীরা মূলত বান্দরবান, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফুল সংগ্রহ করে শুকিয়ে সারা বছর ঝাড়ু তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়।আধুনিক গৃহস্থালির নানা সরঞ্জাম বাজারে এলেও ফুলঝাড়ুর চাহিদা এখনও কমেনি। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে উৎপাদিত ঝাড়ু বিক্রিতে উদ্যোক্তাদের তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না।কুনিয়ারী গ্রামের শ্রমিক আলম খান প্রায় এক দশক ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০টি ঝাড়ু তৈরি করতে পারেন। এতে তাঁর দৈনিক আয় হয় প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। এই আয় দিয়েই তিনি পরিবার নিয়ে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন।আরেক শ্রমিক খলিল শেখ বলেন, “আমরা শুধু ঝাড়ু তৈরি করি, কাঁচামাল মালিকের। প্রতিটি ঝাড়ুর জন্য ৪ থেকে ৬ টাকা মজুরি পাই। এতে আগের তুলনায় সংসারের অবস্থা অনেক ভালো হয়েছে।”নারী শ্রমিক পারুল বেগম বলেন, “আগে শুধু স্বামীর আয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। এখন কারখানায় কাজ করে দিনে প্রায় ৩০০ টাকা আয় করি। এতে সংসারে অনেকটা স্বস্তি এসেছে।”ঝাড়ু কারখানার মালিক মো. কবির হোসেন জানান, একজন দক্ষ শ্রমিক কয়েক মিনিটেই একটি ঝাড়ু তৈরি করতে পারেন। শ্রমিকেরা প্রতিটি ঝাড়ুর জন্য ৪ থেকে ৫ টাকা মজুরি পান। পাইকারি বাজারে একটি ঝাড়ু ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে এর দাম ১০০ টাকারও বেশি।তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, কাঁচামাল সংগ্রহ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবসায়ী মো. মিলন বলেন, উলুফুল সংগ্রহ ও পরিবহনে নানা জটিলতা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচও বেড়েছে। ফলে ব্যবসা পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।স্থানীয়দের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই ক্ষুদ্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।এ বিষয়ে পিরোজপুর বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) এইচ এম ফাইজুর রহমান বলেন, “ফুলঝাড়ু শিল্পে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। বিসিকের নীতিমালা অনুযায়ী ঋণ বা অন্য কোনো সহায়তা চাইলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।”স্থানীয়দের আশা, প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতিগত সহায়তা পেলে নেছারাবাদের ফুলঝাড়ু শিল্প আরও সম্প্রসারিত হবে। এতে যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, তেমনি আরও অসংখ্য পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

টেকনাফের হোয়াইক্যং খারাংখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোহাম্মদ আলম

নেছারাবাদে ফুলঝাড়ু শিল্পে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান পাচ্ছেন শত শত মানুষ

Update Time : 05:47:18 pm, Tuesday, 23 June 2026
৪২

মো. শামীম হোসাইনপিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলা-এর বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ওঠা ফুলঝাড়ু শিল্প এখন শত শত মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। কম পুঁজি, সহজ প্রযুক্তি এবং স্থানীয় শ্রমনির্ভর এই শিল্পে কাজ করে নারী-পুরুষ উভয়েই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ফলে অনেক পরিবারের জীবনযাত্রায় এসেছে স্বচ্ছলতা।উপজেলার মাগুরা, অলংকারকাঠী, পানাউল্লাহপুর, কুনিয়ারী, সংগীতকাঠী, সুটিয়াকাঠি, নান্দুহার ও জনতা বাজার এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি ছোট-বড় ফুলঝাড়ু কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় সরাসরি কাজ করছেন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিক।ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। কেউ ঝাড়ুর শলা ছাঁটছেন, কেউ হাতল লাগাচ্ছেন, আবার কেউ স্কচটেপ পেঁচিয়ে ঝাড়ুকে বাজারজাতের উপযোগী করে তুলছেন। পুরুষ শ্রমিকেরা উলুফুল ও পাটখড়ি গুনা দিয়ে ঝাড়ুর মূল অংশ তৈরি করেন। পরে নারী শ্রমিকেরা স্কচটেপ বা পিভিসি পাইপ লাগিয়ে কাজ সম্পন্ন করেন।ফুলঝাড়ু তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো উলুফুল বা ঝাড়ুফুল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ফুল পাওয়া গেলেও ব্যবসায়ীরা মূলত বান্দরবান, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফুল সংগ্রহ করে শুকিয়ে সারা বছর ঝাড়ু তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়।আধুনিক গৃহস্থালির নানা সরঞ্জাম বাজারে এলেও ফুলঝাড়ুর চাহিদা এখনও কমেনি। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে উৎপাদিত ঝাড়ু বিক্রিতে উদ্যোক্তাদের তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না।কুনিয়ারী গ্রামের শ্রমিক আলম খান প্রায় এক দশক ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০টি ঝাড়ু তৈরি করতে পারেন। এতে তাঁর দৈনিক আয় হয় প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। এই আয় দিয়েই তিনি পরিবার নিয়ে স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করছেন।আরেক শ্রমিক খলিল শেখ বলেন, “আমরা শুধু ঝাড়ু তৈরি করি, কাঁচামাল মালিকের। প্রতিটি ঝাড়ুর জন্য ৪ থেকে ৬ টাকা মজুরি পাই। এতে আগের তুলনায় সংসারের অবস্থা অনেক ভালো হয়েছে।”নারী শ্রমিক পারুল বেগম বলেন, “আগে শুধু স্বামীর আয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। এখন কারখানায় কাজ করে দিনে প্রায় ৩০০ টাকা আয় করি। এতে সংসারে অনেকটা স্বস্তি এসেছে।”ঝাড়ু কারখানার মালিক মো. কবির হোসেন জানান, একজন দক্ষ শ্রমিক কয়েক মিনিটেই একটি ঝাড়ু তৈরি করতে পারেন। শ্রমিকেরা প্রতিটি ঝাড়ুর জন্য ৪ থেকে ৫ টাকা মজুরি পান। পাইকারি বাজারে একটি ঝাড়ু ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে এর দাম ১০০ টাকারও বেশি।তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, কাঁচামাল সংগ্রহ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবসায়ী মো. মিলন বলেন, উলুফুল সংগ্রহ ও পরিবহনে নানা জটিলতা রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচও বেড়েছে। ফলে ব্যবসা পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।স্থানীয়দের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই ক্ষুদ্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।এ বিষয়ে পিরোজপুর বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) এইচ এম ফাইজুর রহমান বলেন, “ফুলঝাড়ু শিল্পে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। বিসিকের নীতিমালা অনুযায়ী ঋণ বা অন্য কোনো সহায়তা চাইলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।”স্থানীয়দের আশা, প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতিগত সহায়তা পেলে নেছারাবাদের ফুলঝাড়ু শিল্প আরও সম্প্রসারিত হবে। এতে যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, তেমনি আরও অসংখ্য পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।