ফায়ার সার্ভিস চালকের করুণ পরিণতি,বাড়ি-জমি বিক্রি করা টাকা না পেয়ে অবশেষে আত্মহত্যা
মিজানুর রহমান (বগুড়া)প্রতিনিধি:-
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একজন গাড়িচালক সিহাব উদ্দিন (পরিচিতি নম্বর: ২০০২/৪০০৬৪১) আত্মহত্যা করেছেন। তিনি বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার নাংলু গ্রামের বাসিন্দা মাহবুবুর রহমানের ছেলে। তার মূল কর্মস্থল ছিল বাঘাবাড়ী ঘাট নদী ফায়ার স্টেশন শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ। তবে অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার হোসেনের টেলিফোনিক নির্দেশে তিনি সায়দাবাদ পাওয়ার প্ল্যান্ট ফায়ার স্টেশন, সিরাজগঞ্জে সংযুক্ত হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে সংযুক্ত কর্মস্থলের কোয়ার্টারে নিজের কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন সিহাব উদ্দিন।
সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় ফায়ার স্টেশনের অন্যান্য সদস্যরা গোসল করতে গেলে সিহাব কক্ষে একাই ছিলেন। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সহকর্মীরা কক্ষে প্রবেশ করে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সহকর্মীর দাবি, সিহাব কয়েকজন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে মোট ৮৫ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েছেন বলে তাদের জানিয়েছিলেন।
তবে চলমান নিয়োগে ওই প্রার্থীদের চাকরি না হওয়ায় তিনি চরম মানসিক চাপে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া পাননি। ঘটনার আগে সিহাবকে মোবাইল ফোনে কারও সঙ্গে অনুনয়-বিনয় করতে দেখা গেছে বলেও দাবি করেন তারা।
এদিকে সিহাবের স্ত্রী লাবনী আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ২০১৯ সালে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার হোসেনের সঙ্গে তার স্বামীর পরিচয় হয়। এরপর থেকে চাকরি ও বদলির বিভিন্ন কাজের জন্য টাকার লেনদেন চলত বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য, ২০২৫ সালের নিয়োগকে কেন্দ্র করে এবং পরবর্তীতে পরিচালকের বদলি ঠেকানোর নামে ধাপে ধাপে মোট ৮৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় এবং টাকা ফেরত না পাওয়ায় তার স্বামী মারাত্মক মানসিক চাপে ভুগছিলেন। এমনকি বাড়ি-জমি বিক্রি করে অনেকের টাকা পরিশোধ করলেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে অভিযোগ করেন।
নিহতের স্ত্রী আরও দাবি করেন, শেষ দিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তার স্বামীর ফোন রিসিভ করতেন না এবং হোয়াটসঅ্যাপেও ব্লক করে দেন। এ ঘটনায় তিনি দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেন। তিনি বলেন,কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ফায়ার সার্ভিসের মধ্যে কিছু দুষ্ট লোক রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
অন্যদিকে,ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। তবে ভয়ের কারণে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না।
এ ঘটনায় সিরাজগঞ্জ সদর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার বাদী ফায়ার সার্ভিসের লিডার মমিন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিরাজগঞ্জ সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বজলুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সংশ্লিষ্টদের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা

