অবহেলিত চর বোয়ালমারী: প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি, তবুও উন্নয়নের ছোঁয়া নেই

৩৬

নিজস্ব প্রতিবেদক | কুড়িগ্রামঃ

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল চর বোয়ালমারী—একটি জনপদ, যেখানে আজও উন্নয়নের চেয়ে বঞ্চনার গল্পই বেশি শোনা যায়। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখনো ভাঙাচোরা রাস্তা, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, মৌলিক সেবার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক অবহেলার মধ্যেই জীবনযাপন করছেন।স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিটি জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধি ও প্রার্থীরা নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গ্রামে আসেন। রাস্তা নির্মাণ, সেতু, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচন শেষ হলে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো আর বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। ফলে বছরের পর বছর ধরে একই দুর্ভোগের মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে চর বোয়ালমারীর মানুষকে।গ্রামবাসীরা জানান, তারা অত্যন্ত সহজ-সরল এবং অল্পতেই সন্তুষ্ট। এই সরলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নেতারা উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়ে ভোট নেন। কিন্তু ভোটের পর তাদের আর খোঁজ মেলে না। স্থানীয়দের ভাষায়, “নির্বাচনের সময় সবাই আপন মানুষ, নির্বাচন শেষ হলেই কেউ আর আমাদের মনে রাখে না।”চরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বর্ষা মৌসুমে কাঁচা রাস্তা কাদায় পরিণত হয়, শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে চলাচল কষ্টকর হয়ে ওঠে। জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয়।স্থানীয়দের দাবি, ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গ্রামের ভোটাররা নিজেদের এলাকার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সাধারণ সদস্য (মেম্বার) ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছিলেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল, এবার অন্তত এলাকার উন্নয়ন হবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ তাদের।গ্রামবাসীর অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও অনেক সময় হয়রানির শিকার হতে হয়। জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে অতিরিক্ত সময় ও ভোগান্তির মুখে পড়তে হয় বলে জানান অনেকেই।এলাকাবাসীর মতে, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনগুলোর পরও তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব চিত্র আগের মতোই রয়ে গেছে। এখন সামনে আবারও স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ইতোমধ্যে শুধু চর বোয়ালমারী গ্রাম থেকেই ৫ থেকে ৬ জন সম্ভাব্য সদস্য (মেম্বার) প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তারা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।তবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে গ্রামবাসীর বড় একটি অংশ এখন আর সহজে আশ্বস্ত হতে চাইছেন না। তাদের দাবি, প্রতিশ্রুতি নয়—প্রয়োজন বাস্তব উন্নয়ন। বিশেষ করে টেকসই রাস্তা নির্মাণ, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, চরাঞ্চলের উন্নয়নে শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পরিকল্পনা, নিয়মিত বরাদ্দ, কার্যকর তদারকি এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা। অন্যথায় চর বোয়ালমারীর মতো গ্রামগুলো উন্নয়নের মূলধারা থেকে আরও পিছিয়ে পড়বে।গ্রামবাসীর একটাই প্রত্যাশা—নির্বাচনের সময় নয়, বছরের প্রতিটি দিন তাদের পাশে থাকবেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে বাস্তব উন্নয়নের মাধ্যমে যেন চর বোয়ালমারীর মানুষও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সমান নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে পারেন।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *