আহমেদ সোহেল
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি এমন একটি সময়, যখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, জনআকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তব প্রশাসনিক সক্ষমতার মধ্যে একটি প্রাথমিক সমন্বয় বা অসামঞ্জস্য দৃশ্যমান হতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনও এর ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন, অন্তর্বর্তীকালীন শাসন এবং বহুল আলোচিত জাতীয় নির্বাচনের পর গঠিত এই সরকারকে ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা যেমন ছিল ব্যাপক, তেমনি চ্যালেঞ্জও ছিল বহুমাত্রিক।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বুঝতে হলে পেছনের দুই দশকের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকাতে হয়। বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে একদিকে যেমন পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বেশ কিছু বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, অন্যদিকে সেই সব প্রকল্প বাস্তবায়নে সীমাহীন দুর্নীতি, গণতন্ত্র হত্যা, নির্বাচন ব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্রযন্ত্র ক্রমশ একদলীয় নিয়ন্ত্রণের দিকে ধাবিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক বিরোধিতাকে দমন করার প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে।
বিশেষ করে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং কথিত ‘আয়নাঘর’-এর মতো বিষয়গুলো দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছে। বহু পরিবার বছরের পর বছর তাদের স্বজনদের সন্ধানের অপেক্ষায় থেকেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন এবং রাজনৈতিক মহলের বক্তব্যে এসব বিষয় বারবার উঠে এসেছে। একই সঙ্গে নির্বাচনকে ঘিরে জনগণের একটি অংশের মধ্যে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল, তা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এরই ধারাবাহিকতায় জুলাই আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। আন্দোলনের সময় প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের স্মৃতি এখনও জাতীয় আলোচনার অংশ। সেই ঘটনাগুলোর বিচার, জবাবদিহিতা এবং ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিয়ে এখনও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, নতুন সরকারের সামনে অন্যতম বড় দায়িত্ব হলো অতীতের ক্ষত নিরাময় করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা।
এই পটভূমিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের প্রথম লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সরকার শুরু থেকেই প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনা, জনসেবামূলক উদ্যোগ সম্প্রসারণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
প্রথম ১০০ দিনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য একটি সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রণোদনা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার বিষয়েও সরকারের আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শিক্ষা খাতেও কিছু নতুন উদ্যোগের ঘোষণা এসেছে। বিশেষ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদানের পরিকল্পনা ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। নারীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যও এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। যদিও এসব কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়নের জন্য আরও সময় প্রয়োজন হবে, তবুও নীতিগতভাবে এগুলো ইতিবাচক বার্তা বহন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধানে সরকারের সক্রিয়তা সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়ক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর নাগরিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। যদিও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের জন্য আরও বিস্তৃত সংস্কার প্রয়োজন।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এবং এখনও রয়েছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভোক্তাদের স্বস্তি দেওয়ার প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো, এসব উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলন যেন বাজারে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
ধর্মীয় ও সামাজিক কল্যাণমূলক ক্ষেত্রেও কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে বিষয়টি বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়েও সরকারের তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিস্তা অববাহিকার মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি উৎপাদন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব বহুদূর বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আরও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান গ্রহণের ইঙ্গিতও সরকার বিভিন্ন সময়ে দিয়েছে।
তবে প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে শুধু সাফল্যের তালিকা দেখলেই চলবে না; রাজনৈতিক বাস্তবতার জটিল দিকগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা, বিদেশে অবস্থানরত দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান তীব্র রাজনৈতিক প্রচারণা এবং রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা নিয়ে সরকারের উদ্বেগ প্রকাশ্যে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারকে যেমন সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা করতে হবে, তেমনি গণতান্ত্রিক সহনশীলতা, আইনের শাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংঘাত, বিভাজন এবং অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে নতুন সরকারের প্রতি তাদের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। তারা শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক আচরণ এবং জনসেবার মানের পরিবর্তন দেখতে চায়।
ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, কোনো সরকারের সাফল্য প্রথম ১০০ দিনে নির্ধারিত হয় না। তবে প্রথম ১০০ দিন একটি দিকনির্দেশনা দেয়। এটি বোঝায় সরকার কোন পথে হাঁটতে চায়, কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং জনগণের সঙ্গে তার সম্পর্ক কতটা দৃঢ়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১০০ দিন তাই একদিকে যেমন প্রত্যাশার সূচনা, অন্যদিকে তেমনি বাস্তবতারও পরীক্ষা। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আলোচনায় আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জীবনযাপন, জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক আচরণ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরত্ব নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের তুলনামূলক সরল জীবনধারা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত শোনার উদ্যোগ অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, তার সরকারের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো বিরোধী মতের প্রতি তুলনামূলক সহনশীল মনোভাব প্রদর্শনের চেষ্টা। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার আহ্বান, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা জনমনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
দলমত নির্বিশেষে অনেকেই মনে করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে; তবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংলাপ এবং সহনশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সরকারের প্রথম ১০০ দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন বক্তব্য, রাজনৈতিক আচরণ এবং জনসম্পৃক্ত কার্যক্রমে সেই বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে বলে তার সমর্থক ও পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করে। যদিও এসব উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা সময়ই নির্ধারণ করবে, তবুও রাজনৈতিক সৌজন্য ও জনসম্পৃক্ততার এই ধারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সামনে পথ দীর্ঘ, চ্যালেঞ্জও কম নয়। কিন্তু যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ পায়, তবে এই ১০০ দিন ভবিষ্যতের বৃহত্তর পরিবর্তনের ভিত্তি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে জনগণের জীবনে তার প্রভাবের ভিত্তিতে। কারণ গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে কোনো দল নয়, কোনো সরকার নয়—শেষ কথা বলে জনগণ।
লেখকঃআহমেদ সোহেল ।নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক , কলামিস্ট এবং সাধারণ সম্পাদক,নিউইয়র্ক নিউ হারাইজ লায়ন ক্লাব ।