পুরুষদের কি মেনোপজ হয়? — বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

পুরুষদের কি মেনোপজ হয়? — বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

মাহবুবুল আলম ফারুকী

মেনোপজ শব্দটি সাধারণত নারীদের জীবনের একটি স্বাভাবিক জৈবিক পর্যায়কে নির্দেশ করে, যখন নির্দিষ্ট বয়সের পর ডিম্বাশয়ের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যায় এবং ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়। এ সময় নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুরুষদের ক্ষেত্রেও কি এমন কোনো মেনোপজ ঘটে?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় পুরুষদের ক্ষেত্রে নারীদের মতো নির্দিষ্ট বয়সে বা হঠাৎ করে মেনোপজ ঘটে না। তবে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অনেক পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এই অবস্থাকে সাধারণভাবে “পুরুষদের মেনোপজ” বা অ্যান্ড্রোপজ (Andropause) বলা হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা সাধারণত লেট-অনসেট হাইপোগোনাডিজম (Late-onset Hypogonadism) বা বয়সজনিত টেস্টোস্টেরন ঘাটতি শব্দগুলো ব্যবহার করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

টেস্টোস্টেরনের ভূমিকাঃ

টেস্টোস্টেরন পুরুষদের প্রধান যৌন হরমোন। এটি যৌন আকাঙ্ক্ষা, শুক্রাণু উৎপাদন, পেশিশক্তি, হাড়ের দৃঢ়তা, শক্তি ও উদ্যম বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের পর টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বছরে গড়ে প্রায় ১ শতাংশ হারে কমতে পারে। তবে এই হার ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয় এবং সব পুরুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে ঘটে না।

সম্ভাব্য লক্ষণঃ

টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে কিছু পুরুষের মধ্যে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

⚡যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া

⚡ইরেকশনজনিত সমস্যা

⚡দ্রুত ক্লান্তি অনুভব করা

⚡পেশিশক্তি ও কর্মক্ষমতা হ্রাস

⚡শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা

⚡হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া

⚡মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া

⚡খিটখিটে মেজাজ ও বিষণ্ণতা

⚡ঘুমের সমস্যা

তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি রয়েছে, এমনটি ভাবা ঠিক নয়। কারণ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্থূলতা, মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা কিংবা ঘুমের ব্যাধিও একই ধরনের উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

বয়স বৃদ্ধির পাশাপাশি কিছু স্বাস্থ্যগত কারণ টেস্টোস্টেরন হ্রাসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেমন—

স্থূলতা

🛑টাইপ-২ ডায়াবেটিস

🛑দীর্ঘমেয়াদি কিডনি বা লিভারের রোগ

🛑ধূমপান

🛑অতিরিক্ত মদ্যপান

🛑দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ

🛑ঘুমের সমস্যা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ জীবনযাপন অনেক ক্ষেত্রেই এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাঃ

টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি নির্ণয়ের জন্য শুধু উপসর্গ পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হরমোনের মাত্রা নির্ণয় করা হয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক অতিরিক্ত কিছু পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমেই গুরুত্ব দেওয়া হয় জীবনযাত্রার পরিবর্তনে। নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং ধূমপান বর্জন অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ কমাতে সহায়ক হয়। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (TRT) দেওয়া হতে পারে। তবে এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয় এবং চিকিৎসকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে গ্রহণ করা উচিত।

উপসংহারঃ

পুরুষদের ক্ষেত্রে নারীদের মতো আকস্মিক ও সর্বজনীন মেনোপজ হয় না। তবে বয়সের সঙ্গে কিছু পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যেতে পারে, যার ফলে নানা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তাই এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে লজ্জা বা ভুল ধারণায় না ভুগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং সময়মতো চিকিৎসাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *