শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া (খুলনা):
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার হরিভদ্রা নদী খনন কার্যক্রম শেষ হলেও তার প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না নদীপাড়ের হাজার হাজার বাসিন্দা। খনন-পরবর্তী অব্যবস্থাপনা এবং নদীর একপাশে ক্রস বাঁধ দেওয়ার ফলে উল্টো পলি জমে নদী ভরাট হয়ে গেছে। এই তীব্র সংকট থেকে মুক্তি পেতে এবং দ্রুত পলি অপসারণের দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
খননের উদ্দেশ্য ব্যাহত: ক্রস বাঁধের খেসারত
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, হরিভদ্রা নদী খননের মূল উদ্দেশ্য ছিল অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থায়ী জলাবদ্ধতা দূর করা এবং কৃষি উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করা। তবে খনন কাজ শেষ হওয়ার পর খর্ণিয়া পাশে একটি ক্রস বাঁধ দেওয়া হয়। এই বাঁধের কারণে নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিপুল পরিমাণ পলি এসে জমেছে।
উজান থেকে আসা পলি অপসারণ না করায় নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে এবং আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ফসলি জমি প্লাবিত হওয়ার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্লাবনের ঝুঁকিতে একাধিক অঞ্চল
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দ্রুত এই পলি অপসারণ করা না হলে বর্ষা মৌসুমে ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া, রুদাঘরা, ধামালিয়া, আটলিয়া, শোভনা এবং পার্শ্ববর্তী কেশবপুর ও মনিরামপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হবে। এতে করে এই অঞ্চলের শত শত কৃষক ও সাধারণ মানুষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়বেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোল্লা আবুল কাশেমসহ একাধিক ভুক্তভোগী বলেন:
“নদী খননের পর খর্ণিয়া পাশে ক্রস বাঁধ দেওয়ায় অপর পিঠে বিপুল পরিমাণ পলি জমে নদী ভরাট হয়ে গেছে। সম্প্রতি ভারী বর্ষায় নদী উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকতে শুরু করলে এই বাঁধ কেটে দেওয়া হয়। কিন্তু বাঁধ কাটা হলেও জমে থাকা পলির কারণে পানি ঠিকমতো সরছে না। বর্তমানে পলি কাটার জন্য মাত্র একটি ড্রেজার মেশিন বসানো হয়েছে, যা এই বিশাল সংকটের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। আমরা এখানে আরও অধিক সংখ্যক ড্রেজার মেশিন বসানোর জোর দাবি জানাচ্ছি।”
প্রশাসনের বক্তব্য ও আশ্বাসের বাণী
জনদুর্ভোগ লাঘবে এবং দ্রুত নদী সচল করতে স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তাদের এই আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ইতিবাচক পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন:
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ সবিতা সরকার বলেন:
“এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে গণস্বাক্ষরিত আবেদনটি আমরা হাতে পেয়েছি। হরিভদ্রা নদীতে ক্রস বাঁধ এবং পরবর্তী সময়ে জমে থাকা পলির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা যে জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। আমি ইতিমধ্যেই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করেছি। জনদুর্ভোগ লাঘবে এবং বর্ষা মৌসুমে যাতে খর্ণিয়া, রুদাঘরাসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত না হয়, সেজন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল কুমার সেন বলেন:
“হরিভদ্রা নদীর খনন কাজ শেষ হলেও ক্রস বাঁধের কারণে কিছু অংশে পলি জমে পানি প্রবাহে সাময়িক বাধা সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের নজরে এসেছে। স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে পানি নিষ্কাশন সচল করতে ইতিমধ্যেই একটি ড্রেজার মেশিন দিয়ে পলি অপসারণের কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে কাজের গতি বাড়াতে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে সেখানে আরও ড্রেজার মেশিন যুক্ত করার বিষয়টি আমরা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছি। আশা করি দ্রুতই নদীটির স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।”
হরিভদ্রা নদী এই অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষের লাইফলাইন। সরকারের কোটি টাকা ব্যয়ে নদী খননের পর যদি ভুল পরিকল্পনার কারণে পলি জট তৈরি হয়, তবে তার দায় সাধারণ জনগণের ওপর বর্তায় না। ড্রেজার মেশিনের সংখ্যা বাড়িয়ে জরুরি ভিত্তিতে এই পাঁচ কিলোমিটারের পলি অপসারণ করা না হলে, সরকারের এই উন্নয়ন প্রকল্প ভেস্তে যাওয়ার পাশাপাশি কয়েক হাজার পরিবার গৃহহীন ও ফসলহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের এই আশ্বাস কত দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়।