শেখ মাহাতাব হোসেন, ডুমুরিয়া (খুলনা):

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিধিমালা উপেক্ষা করে লাইসেন্সবিহীন ও অনিয়মে পরিচালিত ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ডুমুরিয়া সদর, চুকনগর, আঠারো মাইল, শাহপুর, রঘুনাথপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ প্রয়োজনীয় অনুমোদন, দক্ষ জনবল ও মানসম্মত চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয় বাসিন্দা, রোগীর স্বজন এবং স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছু প্রতিষ্ঠানে নিবন্ধিত চিকিৎসকের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয় না। কোথাও প্রশিক্ষণহীন কর্মীদের মাধ্যমে রোগী দেখাশোনা, প্যাথলজি পরীক্ষা, প্রসূতি সেবা কিংবা ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদকের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা নীতিমালা অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বৈধ লাইসেন্স, নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন, নিবন্ধিত চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অগ্নিনিরাপত্তাসহ একাধিক শর্ত পূরণ বাধ্যতামূলক। এসব শর্ত পূরণ না হলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা আইনসম্মত নয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে বিষয়টি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হচ্ছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কাজল মল্লিক অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, অনিয়মের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই চলছে। স্বাস্থ্যসেবা যেন নির্ধারিত মান অনুযায়ী পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে খুলনার সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন বলেন,

“বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম ও শর্ত রয়েছে। ডুমুরিয়াসহ খুলনার কোথাও অবৈধ বা শর্ত ভঙ্গকারী কোনো ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা ইতোমধ্যে একটি কঠোর নির্দেশনা জারি করেছি। যেসব ক্লিনিকের বৈধ লাইসেন্স নেই, দক্ষ জনবল বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই, তাদের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। খুব শিগগিরই আমরা জেলাজুড়ে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযানে নামছি। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কোনো অপশক্তির কাছে আপস করা হবে না।”

আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ সবিতা সরকার বলেন,

“যত্রতত্র অবৈধভাবে ক্লিনিক গড়ে তুলে মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। অভিযানে লাইসেন্সবিহীন ও অবৈধ প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট মালিকদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনস্বার্থে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

প্রতিবেদনের স্বার্থে কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক বা প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ ক্যামেরার সামনে বা আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, তারা লাইসেন্স নবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। আবার কয়েকজন কোনো মন্তব্য করতেও রাজি হননি।

স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা সচেতন নাগরিকদের মতে, একদিনের অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নিয়মিত পরিদর্শন, লাইসেন্স যাচাই, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মান পরীক্ষা, রোগীর অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইনগত পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, অতীতেও কয়েক দফা অভিযান পরিচালিত হলেও কিছুদিন পর আবার অনেক প্রতিষ্ঠান আগের মতো কার্যক্রম শুরু করেছে। তাই এবার ঘোষিত অভিযান যেন কেবল সাময়িক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহির মাধ্যমে নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।